Tuesday, June 30, 2020

একটা স্বপ্নের গল্প - চতুর্থ পর্ব

আজ শুক্রবার বার। আদিল ঘুমাচ্ছে। আদিলের একটা বাজে অভ্যাস আছে। বাসায় ফিরে প্রতিদিন বই পড়ে। কাজে আসবে কি না জানে না। জানার ইচ্ছা অদম্য। অল্প কিছুক্ষন সুমাইয়ার সাথে কথা বলছে। বাকী রাতটা বসে বই পড়ছে। আজকে সে পল হেনরি ও'নিল সম্পর্কে জানল। ভদ্রলোক সমস্যা সমাধানে ওস্তাদ। একটা সমস্যা কিভাবে শিকড় থেকে উপরে ফেলতে হয় তা শিখল। তারপরও বিয়ের সমাধান কিভাবে হবে বুঝতে পারছেনা। 

ছেলেটা অনেক কিছু পড়ে তাই ওর মাথায় অনেক কিছু আসে। অনেক চিন্তা আসে। সমাজ, সংসার, অফিস নিয়ে। কিন্তু বস্তবতায় ওর এই বিদ্যার কোন প্রয়োজন নাই। যার সাথেই কথা বলে সে ওর কথার গুরুত্বই দেয় না। সমবয়সী ছেলে মেয়েরা অন্য জগৎ নিয়ে ব্যস্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের জীবনের অনেক বড় অংশ দখল করে আছে। আদিলের জীবনে যে এর ছোয়া নাই তা নয়। তবে ওর বন্ধু বান্ধুবীরা কেউ তেমন বই পড়ে না। সুমাইয়াকে ভাল লাগার এই আর একটা কারণ সুমাইয়াও বই পড়ে। দুজনের মাঝে একটা বড় প্রর্থক্য আছে, একজন পড়ে জানার জন্যে আর একজন পড়ে সময় কাটানোর করার জন্যে। 

সুমাইয়া পড়ার অভ্যাস পেয়েছে বাবার কাছ থেকে। আর আদিল পেয়েছে ওর মায়ের কাছ থেকে। মানুষের সম্পর্কগুলো কেন তৈরি হয় এটা আজও দুজনের কাছেই দুর্বোধ্য। তারপরও কেমন যেন ভাললাগা কাজ করে দুজনের মাঝেই যখন কথা হয়, দেখা হয়। এই অনুভূতির নামই হয়ত ভালবাসা বা প্রেম বা প্রনয়। একবন্ধুর বাসার বিয়ের অনুষ্টানে পরিচয় দুজনের এরপর বন্ধুত্ব। বয়সের ব্যবধান ২ বছর। বয়সের ব্যবধান ব্যাপারটা সুমাইয়া খুব উপভোগ করে। কারণ সুমাইয়ার ভাই যেমন বোনকে আদর, শাসন করে আগলে রাখে ঠিক এমন একটা অভিভাবক সুলভ আচরণ সে আদিলের মাঝে অনুভব করে যা সুমাইয়ার খুব ভাল লাগে। 

আদিলের অনুভূতিগুলো অন্য রকম। আদিলের কোন ভাই বোন নাই।  আদিল একা বড় হয়েছে। ওর কাছে পৃথিবীর পুরোটাই মা। মা ছাড়া ছেলেটা অচল। মায়ের আদর, শাসন সব কিছুই ভাল লাগে। মারলেও ভাল লাগে। এক সময় মনে হত মা তো গুরুজন মায়ের সাথে মনের অনেক সুপ্ত অনুভুতি আছে যা মায়ের কাছে বলতে পারে না। মনে হয় এমন একজন মানুষ দরকার যার কাছে বলতে পারবে এবং বুঝবে। যদি সুযোগ থেকে সে আদিল কে অনুপ্রনিত করবে। মা অনুপ্রাণিত করে, তারপরও। অনুভূতিগুলো গল্পের মত। আদিল ভাবে কত কিছু করা যায়। দেশের বেহাল দশা দেখে চিন্তা করে কিভাবে এর হাল ফিরিয়ে আনা যায়। একটা ব্যাটারী চালিত গাড়ী বানানোর চিন্তা করে, যে গাড়ীর চার্জ কখনও শেষ হবে না। বাণিজ্যের ছাত্র হয়ে বিজ্ঞান নিয়ে চিন্তা করে। আসলে এগুলো বই পড়ার ফসল। আর আদিল চায় এই সব আবোল তাবোল চিন্তা ভাবনা এমন কারো সাথে আলাপ করবে যে বলবে না তুমি পাগল। আর সুমাইয়া তার উপযুক্ত সঙ্গী। সুমাইয়ার মত শ্রতা পাওয়া দায়। মেয়েটা আদিলের এই সব কল্প কাহিনী শুনতে পছন্দ করে এবং মাঝে মাঝে বলে তোমার তো অন্য কিছু করা উচিৎ ছিল। মেয়েটা এটাও ভাবে এত বুদ্ধীদিপ্ত ছেলেটা এদেশে হয়ত কখনও সমাদর পাবে না। অনেক অনুভূতি কাজ করে ছেলেটার জন্যে।  

আদিলের বাবা শুক্রবার বিকালে হারানো দিনের বাংলা গান শুনে। এইটা আদিলের কাছে অনেক ভাল লাগে। গান গুলো বাবার সাথে সেও শুনে এবং বুঝতে পারে এই গান গুলোতে এখনও যে অনুভূতি আছে, তা আজকালকার গানে নাই। আদিল মায়ের কাছে গেল। নাস্তা করবে। নাস্তা করতে করতে মার কাছে জানতে চাইল সে বাবাকে কিছু বলছে কিনা। মা বলল, নারে এখনও বলি নাই, বিকালে তোর বাবা যখন গান শুনবে তখন গল্প করতে করতে বলব। 

নামাজ আছে তাই সকালেই গোসল করে নিজেকে গুছিয়ে নিল আদিল। মসজিদ থেকে বাসায় ফিরে সবার সাথে খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে গেল। বাবার সামনে থাকতে চায় না। বাবার সাথে ওর সম্পর্কটা বন্ধুর মত না। আবার আগের যুগের বাবারা যেমন ছেলেদের অনেক শাসন করতেন ঐ রকমও না। ইদানীং বাবা আর সন্তানের বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক দেখেতে ওর অনেক ভাল লাগে। একধরনের অদ্ভত আবেগ কাজ করে। ওর কাছে নিজের পরিবার অনেক দামী। পরিবারের সবার দিকে তাকিয়ে অনেক কিছুই সে করতে পারে না। ভবিষ্যতে পারবে কিনা তা জানে না। আত্মবিশ্বাস আছে, অভাব শুধু সাহসের। বাবা যদি কোনদিন ঘাড়ে হাত রেখে বলত যা ভাল লাগে কর, তবে আদিল আর পেছনে ফিরে তাকাত না। অন্য রকম কিছু করে দেখাত। মাঝে মাঝে ভাবে কি করত?

এভাবে ভাবতে ভাবতে বাসা থেকে বের হয়ে রবীন্দ্রসরবর চলে গেল, কিছু বন্ধু আছে আড্ডা দেওয়া যাবে। মন কিন্তু পড়ে থাকল বাসায় মা যখন বাবাকে বলবে তখন কি হবে? 

দুপুরে ভাল খাওয়া দাওয়ার পর জামান সাহেন শোবার ঘরে চলে গেলেন। রান্না ঘর গুছিয়ে আদিলের মা ও চলে আসলেন শোবার ঘরে। এমন সময় জামান সাহেব কথা শুরু করেলেন।

জামান সাহেবঃ আমি কয়েক দিন ধরে কিছু ব্যাপারে চিন্তিত।
আদিলের মাঃ কিছু বল নাই তো 
জামান সাহেবঃ বলার সময় কোথায়, ছেলে বড় হয়েছে সব কথা কি আর ওর সামনে আলাপ করা যায়
আদিলের মাঃ তা যায় না, রাতে তো বলতে পারতে
জামান সাহেবঃ আসলে তুমি সারাদিন খাটাখাটনি কর, এরপর আর কি কথা বলব, ভাবছি তোমাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাই কয়েক দিনের জন্যে, সারাজীবন তো আমরা কষ্টই করলাম সন্তানের দিকে তাকিয়ে।
আদিলের মাঃ ছেলেকে দেখলে আমার সব কষ্ট দূর হয়ে যায়, তোমার হয় না?
জামান সাহেবঃ হয়, কিন্তু আমি তো বাবা তাই নতুন চিন্তা যোগ হয়। এই ধর এখন ওর যে বয়স তাতে একটা সম্পর্ক হওয়া কোন ব্যাপার না। যদি কোন সম্পর্ক থাকে তবে বিয়ের ব্যাপারটা ভাবতে হবে। আজকাল কার ছেলে ওর মতামতই তো আসল। শুধু মেয়েটা যেন জাতের হয়। 
আদিলে মাঃ হ্যা। তুমি তো অনেক কথাই বললে। আমি এব্যাপারে ছেলের সাথে আলাপ করছি এবং ছেলে বলছে তার একটা সম্পর্ক আছে। মেয়ের নাম সুমাইয়া। 
জামান সাহেবঃ আমি অনুমান কখনও ধোকা দেয় না। মা হিসাবে তোমার অনুমান করা দরকার ছিল। 
আদিলের মাঃ মায়েরা সন্তানের অনেক কিছুই অনুভব করতে পারে কিন্তু মুখে বলে না। অপেক্ষা করে যেন সন্তান নিজে থেকে বলে। এই ব্যাপারে কি করবা?
জামান সাহেবঃ ছেলের সাথে আমি একা একটু কথা বলতে চাই। আজ রাতে আলাপ করব। 
আদিলে মাঃ ছেলেকে বকা দিও না কিন্তু।
জামান সাহেবঃ তোমার সারা জীবন এমন কেন মনে হয় যে আমি তোমার ছেলে কে শুধু বকা দিব। ও কি আমার সন্তান না, আমার কি ভালবাসা নাই। 
আদিলের মাঃ তা না, ছেলে টা তোমাকে একটু ভয় পায়। 
জামান সাহেবের চেহারাতে ভাজ পড়ে গেল। আদিলের মায়ের চিরচেনা এই ভাজ। চিন্তিত জামান সাহেব। চিন্তিত কর্কষ কন্ঠে বললেন, আমি একা তোমার ছেলের সাথে কথা বলতে চাই, তোমার ছেলেকে বলে দিও, রাতে খাওয়ার পড়ে বসব। 

কথা বলতে বলতে বিকাল হয়ে গেল। আদিলের মা চা বানাতে রান্না ঘরের দিকে ছুটলেন। আর জামান সাহেব ইউটিউব খুললেন পুরোন দিনের গান শুনবেন বলে। 

রাত ৯ঃ৩০ দিকে আদিল বাসায় ফিরল। হাত মুখ ধুয়ে বাবা মায়ের সাথে খেতে বসল। খেতে খেতে বাবা বললেন, আদিল তোমার সাথে আমার একটু কথা আছে। খাওয়ার পরে আমার সাথে বস। তুমি আর আমি কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ করব। আদিল মনে মনে ভয় পেয়ে গেল। 

মাকে জিজ্ঞাসা করল তুমি থাকবে তো? মা বলল, না বাবা আজকের সময়টা তুই আর তোর বাবা আলাপ কর। ভয় কিসের আমি তো পাশের ঘরেই আছি।
আদিলঃ তোমাকে ছাড়া তো বাবার সাথে তেমন কথা বলিনি, এর এই ব্যাপারে কথা বলতে আমার ভীষণ লজ্জা লাগবে।
মাঃ দেখ না তোর বাবা কি বলে।
আদিলঃ আচ্ছা ঠিক আছে।

আদিলের মনের মাঝে চলতে থাকল এক অজানা এতংক "বাবা কি বলবে"। আদিলের বাবার কথা গুলো আগামী কাল জানাব।

No comments:

Post a Comment

আমি কাপুরুষ

আমি কাপুরুষ চুপ থেকে হারিয়েছি ভাষা ভুলে গেছি কলম ধরা কন্ঠে আমার জমেছে ধুলা জীবনের আয়নাতে আজ হাত আমার বাধা সংসারের পাথরে আটকে গেছে পা এখন আর...